
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে খাগড়াছড়ি জেলা দুর্বার নেটওয়ার্ক ও নারী পক্ষের উদ্যোগে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল — “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব: বাস্তবতা ও প্রত্যাশা।”
মানববন্ধন শেষে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক গীতিকা ত্রিপুরা। উইমেন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরামের সদস্য উখি চাকমার সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন দুর্বার নেটওয়ার্কের সদস্য নমিতা চাকমা, খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের আবাসন বিষয়ক সম্পাদক চাইথোয়াই মারমা, তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি সোনিয়া দাশ, উইমেন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরামের পিংকি বড়ুয়া ও খুরশিদা আক্তার এবং মারমা কল্যাণ সমিতির প্রতিনিধি উক্রাচিং মারমা।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস কমিটি’র আয়োজনে বিগত প্রায় ৩৫ বছর ধরে সুনির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত দুই-তিনটি ব্যতিক্রম ছাড়া সরাসরি আসনে বিজয়ী নারীর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি আসনে নারীর মনোনয়ন ও অংশগ্রহণে ধস নেমেছে।
বক্তারা জানান, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে ৫০ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেওয়ার সুপারিশ করেছিল এবং নারী আন্দোলনের দাবি ছিল কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারী মনোনয়ন। কিন্তু বাস্তবে গড়ে মাত্র ৩.৯৮ শতাংশ মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এবং মনোনয়নের বিপরীতে জয় পেয়েছেন মাত্র ৮ শতাংশের একটু বেশি নারী প্রার্থী। উল্লেখযোগ্য যে, জামায়াতে ইসলামী এবার কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়নই দেয়নি। বক্তারা বলেন, ২৫ বছর পর এবার এত কম সংখ্যক নারী নির্বাচিত হয়েছেন।
বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের নারী আন্দোলন এবং নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের জোর দাবি ছিল সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা, কিন্তু এবারের নির্বাচনেও তা কার্যকর হয়নি।
বক্তারা বলেন, জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা। সংসদে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারীর আনুপাতিক ও অর্থবহ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তারা দাবি জানান, সংরক্ষিত নারী আসন লোক দেখানো প্রতিনিধিত্বমূলক হবে না — নারীর সক্রিয় ভূমিকা ও মতামত দলীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখতে হবে।
সমাবেশে প্রচারপত্র বিতরণ করা হয়। প্রচারপত্রে নারীসহ রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো — সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের নীতিমালা লিখিত করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা; সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি ও নেতৃত্ব পর্যায়ে নারী সংসদ সদস্যদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; নারী সংসদ সদস্যদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা; সাইবার বুলিং ও ডিজিটাল হয়রানিসহ নারীর ওপর সকল সহিংসতা বন্ধে সংসদ সদস্যদের দৃশ্যমান ভূমিকা বাধ্যতামূলক করা; আগামী সকল নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের নীতিমালা গ্রহণ করা এবং সকল পর্যায়ে নারীর প্রতি অসম্মানজনক ও মর্যাদাহানিকর ভাষা ব্যবহার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকরা বিপজ্জনক কর্মপরিবেশ, স্বল্প মজুরি ও দৈনিক ১২ ঘণ্টা শ্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল বের করলে পুলিশ তাদের ওপর হামলা চালায়। পরবর্তীতে ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাবে ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ দিবসটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহকে এটি পালনের আহ্বান জানায়। তখন থেকে সারা বিশ্বে নারীর সম-অধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করতে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।