
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: পার্বত্য খাগড়াছড়ির আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের মতোই বৈচিত্র্যময় তাঁর জীবনের গল্প। ছাত্রজীবনে আঞ্চলিক রাজনীতির উত্তাল স্রোতে গা ভাসিয়ে একদিন বুঝলেন — এই স্রোতে ভেসে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায় না। তখন বেছে নিলেন ভিন্ন পথ। আইনকে পেশা করলেন, জাতীয় রাজনীতিকে করলেন আদর্শ। আজ তিনি একাধারে হাইকোর্টের আইনজীবী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী সমিতির খাগড়াছড়ি জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এই মানুষটির নাম — অ্যাডভোকেট সৃজনী ত্রিপুরা।
সৃজনী ত্রিপুরার রাজনৈতিক সত্তার জন্ম পাহাড়ের আঞ্চলিক আন্দোলনের মাটিতে। ছাত্রজীবনে একটি আঞ্চলিক ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় নেতা হিসেবে তিনি সংগঠন, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন। কিন্তু অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভেতরে একটি প্রশ্ন বড় হতে লাগল — আঞ্চলিক কাঠামোয় থেকে কি সত্যিই মানুষের জীবন বদলানো সম্ভব?
উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন — জাতীয় রাজনীতিই হবে তাঁর ক্ষেত্র। ২০১২ সালে যোগ দিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল — বিএনপিতে। সেই থেকে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি নীরবে, নিষ্ঠায় নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন দক্ষ সংগঠক ও বিশ্বাসযোগ্য নেতা হিসেবে।
তাঁর ভাষায়, “সাধারণ খাগড়াছড়িবাসীর সেবা করে তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হলে জাতীয় রাজনীতির বিকল্প নেই। আঞ্চলিক কাঠামোয় মানুষের জন্য যতটুকু করা যায়, জাতীয় রাজনীতিতে তার চেয়ে অনেক বেশি করা সম্ভব।”
আদালত থেকে রাজপথ — দুই জগতের এক মানুষ
২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে সৃজনী ত্রিপুরার জীবনে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। প্রতিদিন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি দেখছেন সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোর মুখ — নির্যাতিত নারী, বঞ্চিত শিশু, ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় থাকা পরিবার। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু একজন ভালো আইনজীবী নয়, একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলছে।
রাজনীতি ও আইনের বাইরেও তাঁর আরেকটি পরিচয় আছে। গান ও নৃত্যে সমান পারদর্শী এই নারী পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে বহন করেন গর্বের সঙ্গে। মঞ্চে বক্তৃতায় যখন তিনি কথা বলেন, তখন যুক্তির দৃঢ়তা আর ভাষার উষ্ণতা মিলে এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি হয় — শ্রোতা একসঙ্গে মুগ্ধ হন, অনুপ্রাণিতও হন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়, আলোচনায় দুটি পদ
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৃজনী ত্রিপুরাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি অংশ তাঁকে দেখতে চাইছেন সংরক্ষিত নারী সাংসদ হিসেবে, আরেকটি অংশের দাবি — তিনিই হওয়া উচিত খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের পরবর্তী চেয়ারম্যান। এই দুটি সম্ভাবনা নিয়ে খাগড়াছড়ির রাজনৈতিক মহলে এখন উত্তপ্ত আলোচনা চলছে।
কিন্তু এত আলোচনার মাঝে সৃজনী ত্রিপুরা নিজে কতটা শান্ত — তাঁর সঙ্গে কথা বলে তা স্পষ্ট হয়ে গেল।
সংরক্ষিত নারী সাংসদ বা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান — এই দুটি পদের যেকোনোটিতে তাঁকে দেখার প্রত্যাশা কি তাঁর নিজেরও আছে? প্রশ্নটি শুনে একটু থামলেন সৃজনী ত্রিপুরা। তারপর বললেন, “কিছু হওয়া বা না হওয়াটা নিজের ইচ্ছাই যথেষ্ট নয়। জনগণের সমর্থন এবং খাগড়াছড়ির সাংসদ ওয়াদুদ ভূইয়ার আশীর্বাদ ছাড়া এখানে কেউ চাইলেই জনসেবার চেয়ারে বসতে পারবেন না।”
ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষের প্রশ্নে তিনি আরও স্পষ্ট। “লিডার ওয়াদুদ ভূইয়া যাকে যোগ্য মনে করে দায়িত্ব দেবেন, আমার কোনো আপত্তি নেই। তিনি চিন্তা-ভাবনা করেই সিদ্ধান্ত নেন — এই বিশ্বাস আমার আছে।”
তবে দায়িত্ব এলে তিনি যে পিছপা হবেন না, সেটাও জানালেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় — “আমাকে যদি দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে আমার দক্ষতা, সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার সবটুকু ঢেলে দেব জনসেবায়। মানুষের আস্থার প্রতিদান দেওয়াটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”
খাগড়াছড়িতে জেলা পরিষদ য়ারম্যান পদের জন্য চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ১০ জনেরও বেশি বিএনপি নেতাকর্মী ইতোমধ্যে লবিং শুরু করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে সৃজনী ত্রিপুরার মন্তব্য ছিল নির্মোহ ও পরিপক্ব।
“এটা তাদের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা। যে কেউ প্রত্যাশা করতেই পারেন। তবে দলীয় প্রধান ও স্থানীয় সাংসদের আশীর্বাদ এবং জনসমর্থন ছাড়া কেউ যদি প্রত্যাশা করেন, সেটা হবে বোকামি।”
এমনকি বিএনপির বাইরের কেউ যদি জেলা পরিষদের চেয়ারে বসেন — সে বিষয়েও তিনি রাখলেন সহনশীল মতামত। “স্থানীয় সাংসদ যদি মনে করেন বিএনপির বাইরের কাউকেও যোগ্য বিবেচনায় দায়িত্ব দেবেন, তাহলেও স্বাগত জানাতে হবে। নেতা নিশ্চয়ই ভেবে-চিন্তেই এ সিদ্ধান্ত নেবেন।”
এই পরিপক্বতা ও বিনয়ই সৃজনী ত্রিপুরাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নারী হিসেবে, আইনজীবী হিসেবে, সংগঠক হিসেবে — তিনটি পরিচয়ের মিলিত শক্তিতে সৃজনী ত্রিপুরা আজ খাগড়াছড়ির রাজনৈতিক পটভূমিতে একটি আলাদা জায়গা তৈরি করে নিচ্ছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মাঝে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, আইনি জ্ঞান আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সমন্বয় তাঁকে পরিণত করছে একটি বিশ্বস্ত নামে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর নাম যত ছড়িয়ে পড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে — খাগড়াছড়ি এমন একজন নেতার অপেক্ষায় আছে, যিনি আইন, মানবিকতা আর রাজনৈতিক সাহসের মিশেলে এই জনপদের মানুষের স্বপ্নের কথা বলতে পারবেন। সৃজনী ত্রিপুরা সেই অপেক্ষার উত্তর হয়ে উঠছেন কিনা — সময়ই বলবে। তবে প্রত্যাশার আলোটা এখন তাঁর দিকেই।
ছবির ক্যাপশন:
আঞ্চলিক ছাত্র রাজনীতি থেকে হাইকোর্টের আইনজীবী, সেখান থেকে বিএনপির সংগঠক — এক অদম্য নারী সৃজনী ত্রিপুরা।