মোঃ আবু সুফিয়ান বাবু, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: রমজান মাসের সমাপ্তিতে মুসলিম উম্মাহর জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরা)। ঈদুল ফিতরের আগে আদায়কৃত এই দান সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের উপর ওয়াজিব। এর মাধ্যমে রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণ হয় এবং দরিদ্রদের ঈদের আনন্দে শরিক করা হয়।
ফিতরা কী ও কেন?
ফিতরা শব্দটি “ফিতর” থেকে এসেছে, যার অর্থ রোজা ভাঙা। ইসলামী শরিয়তে এটি ঈদুল ফিতরের পূর্বে প্রদেয় একটি নির্ধারিত দান।
ধর্মীয় সূত্র অনুযায়ী, ফিতরার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো—রমজানের রোজাকে পবিত্র করা
দরিদ্রদের ঈদের দিনে খাদ্যের ব্যবস্থা করা
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে ফিতরা প্রদান করে, তা গ্রহণযোগ্য জাকাত হিসেবে গণ্য হবে। আর নামাজের পরে দিলে তা সাধারণ সদকা হিসেবে বিবেচিত হবে।”
— (সহিহ আবু দাউদ: ১৬০৯)
কুরআন ও হাদিসের আলোকে গুরুত্ব
পবিত্র কুরআনের আল-কুরআন-এ আত্মশুদ্ধি ও দানের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আল-আ‘লা (১৪-১৫)-তে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“সফল হয়েছে সেই ব্যক্তি, যে পবিত্রতা অর্জন করেছে এবং তার রবের নাম স্মরণ করে সালাত আদায় করেছে।”
মুফাসসিরদের মতে, এখানে “তাযাক্কা” শব্দ দ্বারা ফিতরার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
কার উপর ফিতরা ওয়াজিব?
ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী—
যে মুসলিম ঈদের দিন নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত সম্পদের মালিক হন
পুরুষ, নারী, শিশু এমনকি নবজাতকের পক্ষ থেকেও
পরিবারের গৃহকর্তা পরিবারের সকল সদস্যের ফিতরা আদায় করবেন।
ফিতরার পরিমাণ কত?
হাদিস অনুযায়ী, মহানবী মুহাম্মদ (সা.) এক সা’ (প্রায় ৩ কেজি) খেজুর, যব, কিশমিশ বা গম পরিমাণ খাদ্য নির্ধারণ করেন।
বর্তমানে খাদ্যদ্রব্যের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের আলেমরা ফিতরার আর্থিক পরিমাণ নির্ধারণ করে থাকেন।
আদায়ের সঠিক সময়
সর্বোত্তম সময়: ঈদের নামাজের আগে
রমজানের শেষ দিনগুলোতে আগাম আদায় করা বৈধ
ঈদের নামাজের পর দিলে তা সাধারণ সদকা হিসেবে গণ্য হবে
কারা ফিতরা পাওয়ার যোগ্য?
ফিতরা বিতরণ করা যাবে—
ফকির ও মিসকিন
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি
এতিম ও বিধবা
অসহায় মুসাফির।
যাদের দেওয়া যাবে না—
ধনী ব্যক্তি
নিজের পিতা-মাতা বা সন্তান
যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিজের ওপর
মসজিদ বা প্রতিষ্ঠানে সরাসরি।
বিতরণে সতর্কতা
ধর্মীয় আলেমরা বলছেন, ফিতরা এমন ব্যক্তির হাতে পৌঁছাতে হবে, যিনি প্রকৃতপক্ষে অভাবগ্রস্ত। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যোগ্য কেউ থাকলে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম।
হাদিসে মহানবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন:
“ঈদের দিনে দরিদ্রদের ভিক্ষার প্রয়োজন থেকে মুক্ত রাখো।”
উপসংহার
ফিতরা কেবল একটি আর্থিক দান নয়, এটি সামাজিক সাম্য ও মানবিক সহমর্মিতার প্রতীক। ঈদের আনন্দকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে সময়মতো ও সঠিকভাবে ফিতরা আদায় করার আহ্বান জানিয়েছেন ধর্মীয় বিশ্লেষকরা।